Baro Pishima (2018)- Review (Bengali)

শ্রীযুক্ত রক্তিম সেনের নেতৃত্বে, ‘আটলান্টা থিয়েটার ওয়ার্কশপ’-এর প্রযোজনায়, বাদল সরকারের নাটক: “বড়ো পিসিমা”।

:: শুভশ্রী নন্দী (রাই)

[শুভশ্রী নন্দী নিয়মিত ভাবে আনন্দবাজার পত্রিকা, আজকাল ও অন্যান্য পত্রিকা জন্য লেখেন এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যানুষ্ঠান উপস্থাপনা করেন।]


সবে সবে হোলি সেরে, ‘হলুদ পোলেনে ঢাকা’ আটলান্টা- যখন গেয়ে ওঠে, ‘বসন্ত এসে গেছে’, সমস্বরে আটলান্টাবাসীরাও তখন সুর মেলান যে: “এ.টি.ডাব্লিউ”-এর ‘নাটক’ ও এসে গেছে।” এ বছরটি একটু বিশেষ,- যেহেতু ‘আটলান্টা থিয়েটার ওয়ার্কশপ’ তাঁদের দশম প্রযোজনাটি, অর্থাৎ বাদল সরকারের ‘বড়ো পিসিমা’ উপস্থাপনা করতে চলেছেন প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক শ্রী রক্তিম সেনের নেতৃত্বে। অষ্টম বছরে তাঁদের দশম উপস্থাপনা বলে দেয়, তাঁদেরই উপস্থাপনার গুণে, আটলান্টার মাটিতে নাট্যপ্রিয়দের হৃদয়ে, তাঁদের জনপ্রিয়তার শিকড় কেমন -কতটা গভীর ভাবে গেড়ে বসেছে।

দিনক্ষণ উপস্থিত। সিঙাড়া ও চায়ে গলা ভিজিয়ে, নাটকের মুডে সিটে বসে টানটান অপেক্ষা। ঋচা সরকার, তাঁর নিজস্ব সাবলীল সুন্দর উপস্থাপনা গুণে শুরুর মুড্ টি এনে দিলেন।

নাটকটি-কে আপাত দৃষ্টিতে হাসির নাটক মনে হলেও, নাটকটির অন্যান্য ডাইনামিকস ও উপাদান অগ্রাহ্য করলে অতিসরলীকরণ হবে। এটি নিঃসন্দেহে একটি সামাজিক নাটক। নাটকের মধ্যে আরেকটি নাটক। শুধু তাই নয়, এটি ‘নাটক’ বিষয় ও সম্পর্কিত সংগ্রামের একটি নাটক। যেখানে ‘নাটক’-ই এখানে মুখ্য নায়ক। যাকে ঘিরে একের পর এক দৃশ্য আবর্তিত হয়েছে। যেখানে একটি নাটকের সফল মঞ্চস্থতা বা মঞ্চায়নের পেছনে যে দৃঢ় নেতৃত্বের ছাতার আওতায় , বিপুলাকার সাংগঠনিক আয়োজন, শৃঙ্খলা, দায়বদ্ধতা, শক্তদলগত কাঠামো, অধ্যবসায়, আত্মবিশ্বাস, প্রত্যয় ও সাফল্য ইত্যাদির দরকার, যাতে এই সমস্ত শক্তি সম্বল করে অনায়াসে পথে আসা বাধা টপকে ‘নাটক’ তার লক্ষ্যে পৌঁছুতে পারে। তেমনি উচাটন-চিন্তা-ত্যাগ-এই সমস্ত অনুভূতি ও অনুভবের আবেগ জড়িয়ে থাকে এই গ্রুপ থিয়েটারের আন্দোলনকে ঘিরে । ‘পার্ট অব দ্য গেম’ হিসেবে অভিনেতা -অভিনেত্রীদের কত আনুষঙ্গিক চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের ব্যতিব্যস্ততা, পরিচালককে ধৈর্যসহকারে সামলাতে হয়- তারও ঝলক সুন্দর করে রয়েছে এই নাটকে। কেউ বা অতিরিক্ত ‘মনোযোগ-সচেতন’, কেউ বা ‘টিম-প্লেয়ার’ না হয়ে নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত। কেউ আবার খুঁতখুঁতে রকম বাতিকগ্রস্ত। একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে যে আধুলি-র এপিঠ ওপিঠের মতো হাসির ওপিঠে রয়েছে ব্যাঙ্গের চালে রূঢ় সত্যের বর্ণনা। ‘ফান্ডে ঘাটতি নেই, টাকা বাঁচবে’ শুনে শম্ভুর রসবোধের প্রতিক্রিয়া “এমেচার থিয়েটার এর নাম ডোবাবে।”-এরকম অনেক হালকা চালে বলা সংলাপই বলে দেয়, গ্রুপ থিয়েটারের নিরন্তর সংগ্রামের কথা।

মুগ্ধ করলো পরিচালক শ্রী রক্তিম সেনের দলের সভ্যদের কাজের প্রতি শ্রদ্ধা, সৌজন্যতা ও সৎ স্বীকারোক্তি “যে নাটকের মধ্যে নাটক হবার দরুন, চরিত্র ফুঁটিয়ে তোলার জন্য অনেককেই ‘স্বেচ্ছাধীন’ অভিনয় করতে না পেরে ‘কম্প্রোমাইজড’ অভিনয় করতে হয়েছে – “যেন গান গাইতে পারা লোককে বলা, গান বেসুরে গাইতে।”

শুরুর দৃশ্যে প্রথম উপস্থিতিতেই চরিত্রগুলো যে যার মত করে নিজস্ব চরিত্রানুযায়ী নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে।

অনু,তার মুখের সলজ্জ্ব লাল আভায় প্রথমে কান্নায় ভেঙে পড়ে, পরক্ষণেই হাসিতে ফেটে পড়ে- সেখানে তার অভিনয় শৈলীর ছাপ সুস্পষ্ট। তাঁর চরিত্রের শেষ দৃশ্যগুলোতে তাঁর সংযত অভিনয় ও মুখের অভিব্যক্তির ছোট ছোট কাজ, শেষের দিকের একটি দৃশ্যে তাঁর হাঁটুতে হাত দিয়ে বসে থাকা , নাটককে ভালোবাসার স্পষ্ট অভিব্যক্তি মুখে খেলে যাওয়া- খুব সুন্দর ফুটে উঠেছে। তাঁর সাজ- চলন-বলন ও অভিনয় একটি কুমারী মেয়ের চরিত্রের সঙ্গে ছিল খুব মানানসই।

শম্ভুর প্রসঙ্গে বলি সারা নাটক জুড়ে একটি মধ্যবয়সের একজন কিভাবে একটি ‘চ্যাঙরা’ ছেলের অভিনয় অসামান্য ভাবে করে যেতে পারে তা দেখে তাক লেগে যায়। মঞ্চে তার হাতুড়ি হাতে অনুপ্রবেশের দৃশ্যটি, সত্যিই ধাক্কা দেয় দর্শক মনে। চমৎকৃত হই এই দেখে যে, কিভাবে সে তার অভিনয় দিয়ে ছাপিয়ে যায় তাঁর ‘দীর্ঘ উচ্চতা’ বা ‘বয়সের সীমাবদ্ধতা’। তবে ‘মেক আপ’ ও ‘পোশাক’ -এর কথা বলতেই হবে। গোটানো পেন্টে, পেছনে ঠেলে দেয়া কলারের থেকে এগিয়ে বেড়িয়ে আসা গলার নড়ন-চড়নে , ‘স’- ‘স’ উচ্চারণে, চপ্পল পড়া পায়ের পা -নাচানোয়, হাঁটুর ওপর নাড়ানো আঙুলের অস্থিরতায়, এক পা ছুঁয়ে দায়সারা প্রণামের স্টাইল , আলপটকা বসার ভঙ্গি, তুড়ি মারা সহ অজস্র-অসংখ্য চরিত্রানুযায়ী বডি ল্যাংগুয়েজে ও লঘু চালের মন্তব্যে মাতিয়ে রেখেছে শম্ভু আগাগোড়াই।

নাটকটিকে স্তম্ভ হয়ে ধরে দাঁড়িয়েছিলেন বড়ো পিসী, পিসেমশাই এবং যোগীন। এরা প্রত্যেকে, -এ বলে ‘আমায় দ্যাখ’ তো ‘ও বলে আমায়’। এঁদের প্রত্যেকেরই সংলাপ নিক্ষেপে ভয়েস মড্যুলেশন ছিল শোনার মত। ভেটেরান অভিনেতা, স্ত্রীর আধিপত্য এড়িয়ে চুরুটে মুক্তি খোঁজা পিসেমশায়ের অভিনয়ের মূল জোড়- তাঁর বুদ্ধিদীপ্ত অভিনয় ও সপ্রতিভতা। ‘আড়ষ্টতা’ বলে কোনো শব্দ তাঁর অভিনয়ের অভিধানে নেই। সেখানেই রয়েছে তাঁর সাফল্যের চাবিকাঠি। তাঁর কন্ঠস্বরের সাথে হিউমারের মেলবন্ধন খুব স্বতস্ফূর্ত। আগাগোডা দর্শকহৃদয় জয় করে দাপটের সাথে অভিনয় করেছেন তিনি। চরিত্রটি তিনি ক্যারি করেছেন যথাযথ।

বড়ো পিসিমার অভিনয় স্পষ্ট করে যে তিনি অভিনয়ের ব্যাপারে কতখানি প্রাজ্ঞ। স্বর নিক্ষেপণে তিনি স্বরের কতরকম ব্যবহার যে করেছেন তা বলার নয় (ভয়েস মডিউলেশন), আর তার সাথে তাল মিলিয়ে মিলিয়ে সংযত অভিনয়। তাঁর গলার খাদে নামিয়ে উচ্চারিত ধিক্কার গুলো এর অন্যতম উদাহরণ যা সটান নাড়া দেয় শ্রোতাদের।ব্যক্তিত্বময়ী, ‘দাপুটে’ অথচ ‘দজ্জাল’ নন – এই ফ্রেমটির ফরমেটে কিভাবে নিজেকে ধরে রাখলেন তিনি- বড়োই মন ছুঁয়েছে। বড়ো পিসির সোফায় এশট্রে -র ওপর বসে আৎকে ওঠা বা তাঁর দাপুটে কণ্ঠে বলা সংলাপ “যোগীন, তোমার সাথে আমার অ-নেক বোঝাপড়া করার আছে |”- অনেকদিন মনে থাকবে।

যোগীন চরিত্র অসাধারণ ভাবে ফুটিয়েছেন অভিনেতা। তাঁর মেক আপ, গেট আপ, সংলাপ ও হাঁটা-চলা সব ছিল একেবারে খাপে খাপে চরিত্র-মাফিক। তাঁর নানা দিক থেকে পারিবারিক চাপের ফলে, টানাপোড়েন, অন্যমনস্কতা, ব্যতিব্যস্ততা আবার কখনো কখনো কন্যার মুখের দিকে চেয়ে দায়িত্বনির্ভর হয়ে ওঠা, আবার চাপের কাছে নতি স্বীকার – এই বিভিন্ন বিপরীতধর্মের অনুভূতিগুলো একই চরিত্রের মধ্যে খুব সূক্ষ্ম ভাবে ফুটিয়েছেন তিনি। এ ব্যাপারে বিশেষভাবে উল্লেখ্য তাঁর পত্রিকা পড়তে পড়তে তিন রকমের অভিব্যক্তিতে তিনটি ‘হুঁ’ বলে ওঠা , যেখানে তাঁর দ্বিধা দ্বন্দ্বে জড়িত চরিত্রটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রতুল নামটি পরিচিত করার সময়, যোগীনের হাসির ফাঁকে যখন বড়ো পিসিমা ক্রস করেন তাঁকে, তখন যোগীনের মন্তব্য, ” অনু বললে চায়ের? অনু বললে?’ অথবা বড়ো পিসীমাকে ” চাপ নিও না” বলার ঢঙে বলা তাঁর উক্তি, ” ঘুরে এসো না, তারপর ধীরে সুস্থে হবেক্ষণ “- বহুদিন মনে থাকবে।

মুগ্ধ করেছে দর্শকদের স্থানীয় সোহিনী সেনগুপ্তকে অর্থাৎ খুকু চরিত্রটিকে আবিষ্কার করে। এখানে পরিচালকের চরিত্র চিত্রণের ক্ষেত্রে সৃষ্টিশীলতার মুন্সিয়ানাকে তারিফ করতেই হয়। কারণ বাদল সরকারের মূল নাটকে এই খুকু চরিত্রটি খুবই স্বাভাবিক বাচ্চা একটি মেয়ে। শম্ভুর ভাইঝি। পরিচালকের কলমের টানে, চরিত্রের ও নাটকের প্রয়োজনে আঁকা হয় খুকুর মানসিক প্রতিবন্ধকতা এবং খুকু-মুখনিসৃত সমস্ত ডায়ালগই নাট্য-পরিচালকের নিজস্ব কল্পনা প্রসূত। এখানেই নাটকটি একটি অন্য ডাইমেনশন পায়।

যেমন মুন্সিয়ানায় চরিত্র চিত্রণ, ঠিক তার সাথে তেমনি তালে তাল মিলিয়ে খুকুর কি তালেবর অভিনয়! “অনুদিদি–“-বলে তাঁর অনুপ্রবেশ ই হোক বা ‘মা, ঘোড়া চড়বো মা” বলে তার নির্গমন-ই হোক –কি মানানসই শরীরী ভাষা-হোয়াট এ বডি লেঙ্গুয়েজ!” এবং অভিনয়ে কি পেশাদারিত্ব! কি নিপুন পটুতার সাথে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে একেকটি সেগমেন্টে কি অসম্ভব তাড়াতাড়ি বিপরীতধর্মী নাটকীয় এবং মৌখিক অভিব্যক্তি, স্বরবিভঙ্গতা ও অঙ্গসঞ্চালনার পরিবর্তন বা ভেরিয়েশন এনে চরিত্রটিকে কেমন জীবন্ত করে তুলেছেন যে বলার নয়, চোখে জল আসে। কণ্ঠ স্বরের ভেরিয়েশন, হাতের সঞ্চালনা, শরীরী প্রকাশ – সবকিছুতেই তিনি চরিত্রের ভেতরে এমনভাবে ঢুকে গেছেন যে তাঁর অভিনয় ‘স্বাভাবিক’ বললেও কিছু কম বলা হয়। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে এত ছোটছোট ট্রান্সিশনের কোলাজ তৈরী করে তার মধ্যদিয়ে, এত অনায়াস ও অবাধ তাঁর যাতায়াত একে ‘শিল্প’ ছাড়া কিছু বলা চলেনা। সেলুকাস পাশে না থাকলেও বলতে বাধ্য হই যে -“মহৎ কিছু দেখিলেই উল্লাস আসে।”

নিতাই চরিত্রটি ও অসামান্য অভিনয় করে গেছেন আগাগোড়া। সংশয়, উচাটন, প্যাশন, মানসিকভাবে দলের অন্যান্যদের ওপর একান্ত মানসিক নির্ভরশীলতা -চরিত্রের এই সবকটি উপাদান তিনি একনিষ্ঠতার সঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছেন তাঁর প্রত্যেকটি দৃশ্যে। তবে তাঁর সেরা দৃশ্য দুটি- যেখানে অনুকে তিনি বলে চলেছেন ‘নার্ভাস হবেনা, …মাথা ঠাণ্ডা ৱেখো” -সেখানে তাঁর মানসিক অস্থিরতার প্রকাশ তাঁর শরীরী ও মুখের অভিব্যক্তিতে খুব সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। আরেকটি দৃশ্য যেখানে ‘পিসিমা-কে কোথায় পাঠানো যায়’-‘ঠনঠনে কালীবাড়ি না কালীঘাট’ এই নিয়ে বাকচলাচালি চলছে তাঁর শম্ভুর সাথে -দুজনেই তালে তাল মিলিয়ে সংলাপ বিনিময় করেছেন যা খুব দর্শক- উপভোগ্য হয়েছিল। এই সুন্দর রসবোধের বোঝাপড়ার সংলাপ বিনিময় এক মুহূর্তের জন্য হালকা ভাবে মনে পড়াচ্ছিলো ‘হুন্ডি না শুণ্ডি’-র দুই দোস্ত কে।

কৌতূহলী ও অত্যুৎসাহী জগৎ -এর বহু অতি- উৎসাহের অঙ্গভঙ্গিমা ও অভিনয় মানিয়েছে ও দর্শক নজর কেড়েছে, যিনি মঞ্চ সংক্রান্তে ডিটেইল্ড ওরিয়েনটেশন বা পুঙ্খানুপুঙ্খতা নিয়ে সদা ব্যতিব্যস্ত। প্রম্পটার হিসেবে দৃশ্য পরিচালনার ছোট ছোট কাজ,তাঁর অযৌক্তিক অনাবশ্যক ছোটাছুটি ও ধমক অগ্রাহ্য করেও, স্টেজ সংক্রান্ত ব্যবস্থাপনায় ‘দায়িত্বসম্পন্ন জগত’- এর ত্রুটিহীন করার আগ্রহ স্পষ্ট হয় তাঁর দর্শক-উপভোগ্য অভিনয়ে।

বৌদির অভিনয় খুবই দায়িত্ব নির্ভর। তুলনামূলকভাবে অল্পবয়সী বৌদি, দেবর প্রায় তাঁরই সমবয়সী। কিন্তু তাঁকে বয়সের চাইতেও অনেকবেশি পরিণতমনস্ক ও অভিভাবকত্বের ভূমিকা পালন করতে হয়েছে। বাঙালী মধ্যবিত্ত সংসারে অসমবয়সের এই আপত্যস্নেহের যে অমলিন সম্পর্ক দেখা যায়, তিনি সেটি ফুটিয়ে তুলেছেন খুব সুন্দরভাবে।সৌম্য-স্নিগ্ধ উপস্থিতির মধ্য দিয়ে তিনি তাঁর কাজটি সুসম্পন্ন করতে পেরেছেন।

মিস্টার সেন: অসাধারণ অভিনয় করেছেন এই চরিত্রটি। আরোপিত ব্যবহার বা ম্যানারিজম টি যেন গুলে হজম করে, তবেই অভিনয় করেছেন যে তাঁর চলন বলনের সাথে একেবারে মানানসই হয়ে গিয়েছিলো। তাঁর সংলাপের ভেতর সংলাপের বাচনভঙ্গি,”আপনি কিন্তু ঠাট্টা করছেন |”- তাঁর হেঁ হেঁ হাসি …এখনো কানে বাজছে

বনানী চরিত্রটি চরিত্রের প্রয়োজনে আনা ‘লাউড ম্যানারিজম’ তিনি আগাগোড়া সচেতন ভাবে সংলগ্নতা রক্ষা করেছেন। বিশেষতঃ অন্যদের সংলাপ চলাকালীন মাঝে মধ্যে তাঁর নিজেকে নিয়ে ‘অবসেশন’ এ থাকা ‘অন্যমনস্ক’ হাসি গোটা দৃশ্যটিকে একটি প্রাণবন্ততা দিয়েছে। এই ম্যানারিজম ও অবসেসিভ চরিত্রায়ন দুটির ভারসাম্যতা তিনি রক্ষা করেছেন সচেতনভাবে।

এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে এই দুই চরিত্রের আরোপিত ব্যবহার একইরকম হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাকে পরিচালক নস্যাৎ করে নিশ্চিত করেছেন এর বিভিন্নতা। এখানেই দক্ষ পরিচালকের পরিচালনা শৈলীর স্বার্থকতা।

পরিচালক রক্তিম সেনের পরিচালনার রাশ ধরে থাকার খুবই প্রশংসা করতেই হয়। কারণ এই সাদামাটা সামাজিক থিমের নাটকটিকে তার নিজস্ব মেজাজ অনুযায়ী, খুব সংযত অভিনয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছেন। উদাহরণ, যে বৌদির অভিনয়ে- যে সিন্ এ ‘মেরেজ রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট’ ছিঁড়ে ফেলার দৃশ্য রয়েছে, দর্শকের সামনে গিয়ে ছিঁড়ে ফেললে সিনটি ‘উগ্র মেলোড্রামাটিক’ হয়ে যাবার সম্ভাবনা থেকে কেউ রক্ষা করতে পারতো না। কিন্তু তা না করে, কেমন সূক্ষ্মতায় বৌদি বেড়িয়ে যেতে যেতে যেন নিজের সঙ্গে আপসোসের সংলাপ রচনা করতে করতে খুব মার্জিত ভাবে ছিঁড়লেন। এই সূক্ষ্মতা গুলো না রাখলে সামাজিক নাটকের অস্তিত্ব বিপন্ন হবার সম্ভাবনা থেকে যায়। এগুলোই দীর্ঘকালীন পরিচালনার অভিজ্ঞতার ফসল।

এক পায়ে খাঁড়া, হন্তদন্ত ব্যস্তবাগীশ অনাথবন্ধুর অভিনয় ছিল খুব সাবলীল। তাঁর চরিত্রের মতোই তাঁর অভিনয়েও পরিস্ফুট হয়েছে দায়িত্বজ্ঞানসম্পন্নতা। এবং বড়ো পিসিকে ভয় পেয়ে অনাথবন্ধুর পালিয়ে যাওয়া, অনেকদিন মনে থাকবে। জগতের মতো সেও ও এক একনিষ্ঠ থিয়েটার সৈনিক। দড়ি এনে রাখা থেকে- দৃশ্য গুলোকে সুসম্পন্ন করা, মায় শম্ভুর সকল নির্দেশ মান্য করে নিরন্তর ছুটে চলার মধ্যে এই চরিত্রটি তাঁর অভিনয়ের একনিষ্ঠতা প্রমাণ করতে পেরেছে।

রাজীব চরিত্রটিও তাঁর মজাদার স্বভাব চরিত্র অনুযায়ী আসর বাজিমাত করেছে। থিয়েটার এর প্রতি তাঁরও আগ্রহ এবং সাথে মাঝে মধ্যেই হিউমারের প্রকাশের মধ্যে তাঁর চরিত্রটি উজ্জ্বলতা পায়। খুব সুন্দর তিনি ফুটিয়েছেন তাঁর চরিত্র। বেশ উৎসাহ যোগান, (কালবৈশাখী.. .উড়িয়ে নিয়ে যাবে), সংলাপ প্রায়োগিক ও সহজ করতে সমস্যার সমাধান যোগান (‘মা ডাকছেন’ শুধু বলা) – বেশ দায়িত্বশীল পাশে থাকা নাট্য কর্মীর ভূমিকা তিনি অভিনয়ের মধ্যে পালন করেছেন স্বচ্ছন্দে।

ধ্রুবেশ: আগাগোড়া প্রয়োজনানুযায়ী অভিনয় করেছেন। তাঁর পোশাকের সঙ্গে সংলাপ ও অভিনয় ছিল খুবই মানানসই। প্রথম দৃশ্যে সুস্পষ্ট উচ্চারণে, তাঁর নাটকের ভেতরে নাটকের সংলাপগুলো খুব মনোগ্ৰাহ্য মনে হয়েছে। ভিলেন হিসেবে তাঁর খলচাতুরী মন্তব্য- যাতে কান্নায় ভেঙে পড়ে নায়িকা, তীরের মতো এসে বেঁধে দর্শক চিত্তে। নাটকের একনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে সমস্ত দৃশ্যে তাঁর অভিনয় ছিল সাবলীল।

শশাঙ্ক চরিত্রটি খুব ভালোভাবেই ফুটিয়েছে ‘পিসিমা ট্রমা’-তে আক্রান্ত -হতচকিত ব্যবহার। তিনটি গুলি খেয়ে পড়ে যাওয়া খুব সাবলীল ও পাকা অভিনয়। এতটুকু অতি-অভিনয় তাতে ছিল না। নাটককে এগিয়ে নিয়ে যেতে জগৎ,,রাজীব,অনাথ-এর সাথে তাঁকে নিয়ে যে চতুরঙ্গ তৈরী হয়েছে- নিতাই ও শম্ভুকে সাপোর্ট সিস্টেম দেয়ার জন্য , তিনি সেটা নির্দ্বিধায় সফল ভাবে অভিনয়ে দেখতে পেরেছেন।

সেটিং ছিল আক্ষরিক অর্থে জ ড্রপিং। বসারঘরে টাঙানো বিদ্যাসাগরের ছবি এবং সাথে সংলাপে ফুটে ওঠা মূল্যবোধের অবক্ষয় ক্ষয়িষ্ণু সময়টাকে ধরতে সাহায্য করেছে। এই ধরণের ডিটেইল্ড পেশাদারী সেটিং -এর জন্য ‘সাতশো সাধুবাদ’-ও এর জন্য যথেষ্ট নয়। দরজা সংলগ্ন ঝোলানো বারান্দা এত নিখুঁত ও ডিটেইল্ড এবং জানালার গ্রীলের ডিজাইনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে বানানো, যা ‘সাধু সাধু’ বলে তারিফ না করে পারা যায়না। হয়তো এটি দৃশ্যমান করার জন্যই পর্দাটি গ্রীলের পেছনে লাগাতে হয়েছে।

এমন অসাধারণ লাইব্রেরিটি ছিল সত্যিই দেখনদার। তবে কর্ণার গুলোতে একটু ভিন্নতা আনলে দরজার কাঠামোর সাথে উচ্চতা ছাড়াও স্ট্রাকচারেল বা গঠনগত তফাৎ আনা যেত।

একটি সংলাপে ‘ও মাই গশ’ না বলে ‘গড’ বললেই ভালো হতো, যেহেতু শুরুর দৃশ্যে ‘হাওড়া স্টেশন’, ও পরে ‘ঠনঠনে কালীবাড়ি’ ও ‘কালীঘাট’ এর উদ্ধৃতি — সেটিং যে দেশীয় তা বলবার আর অপেক্ষা রাখে না।

নাটকের মাঝখানে ব্যবহৃত সঙ্গীতের ছোট ছোট কাজগুলোয় ছিল সূক্ষ্মতা। যেমন অর্থবহতা বোঝার জন্য খুব হালকা পরিমিত তালের ছন্দের ব্যবহার -যখন শম্ভু বলছে যে ‘নিতাইদা প্ল্যান ভেস্তে গেছে বা পিসিমাকে নিয়ে বৌদি খাওয়াচ্ছে’ অথবা ট্যাক্সির হর্ন আবার চলন্ত রাস্তার অনেকগুলো গাড়ির হর্ন -ইত্যাদি। কোন্নগর যাবার পরের দৃশ্যের সংগীত প্রয়োগ মন ছুঁয়ে যায়। শুরুর দৃশ্যে ট্রেনের সাথে সঙ্গত মূর্ছনার ব্লেন্ডিং সুন্দরের প্রকাশ।

হালকা আলোর কাজেও ছিল রুচিশীলতার প্রকাশ।

পোশাক আশাক, মেক আপ, সেটিং ও প্রপস ম্যানেজমেন্ট- এর পেশাদারিত্ব মুগ্ধ করেছে দর্শকদের। যেকোনো সামাজিক নাটকের পোশাক চিত্রণ ‘সাধারণ’ হয় বলেই ‘সহজ’ নয়। এই ক্ষেত্রে একটি ক্ষেত্রেও মনে হয়নি যে কোথাও একটু বেমানান।

টানা আড়াই ঘণ্টা জুড়ে নন-স্টপ একটি সামাজিক নাটক মঞ্চস্থ করার যে এলেম দরকার, শ্রী রক্তিম সেনের নেতৃত্বে ‘এ.টি.ডাব্লিউ.’ সেটি সাফল্যের সাথে করে দেখিয়ে দিয়েছে। একটা সেটিং -অর্থাৎ একটি বসার ঘরের মধ্যেই দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তর দেখা গিয়েছে। শুধু ট্রেনসিশন সিনের ক্ষেত্রে দরজাটি একটি বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে। সামাজিক নাটকের আবেদনটাই থাকে এমন যে, হাল্কা চালে মুখোশের আড়ালে নাটকের ‘সংলাপ’ অনেক জীবন সমস্যা যেমন তুলে মেলে ধরে, তেমনি সচেতনতা জাগরণের জন্যও কড়া নাডায়। যেমন এই ক্ষেত্রে অনেক কথা ছিল নাটকটির বক্তব্যে। সেই সময়ে থিয়েটারকে কর্মক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেয়া মধ্যবিত্ত মেয়েদের সামাজিক চক্ষুরাঙানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ। যদিও, এক্ষেত্রে ‘অতিক্রম’- এর পর্ব শেষ হয়েছে মিলনাত্মক নাটকান্তে।

আপাতদৃষ্টিতে খুব সরল সাধারণ মনে হলেও, নাটকটির গঠনই এমন যে ‘রূপক’ হয়ে প্রতীকি নাটকের গ্রীনরুম ও মঞ্চ হয়ে উঠল, আসল নাটকের ‘প্রেক্ষাপট বা ব্যকড্রপ’। করতালিতে উপচে পড়ছে শব্দ। তার আগে জুড়ে ছিল আশঙ্কা ও উচাটন যে আদৌ নাটকটি দর্শক হৃদয় জয় করে উঠতে পারবে কিনা। সফল হবে কিনা এত অধ্যবসায়ের প্রচেষ্টা।

শিল্পী মাত্রেই সকলকে আয়নার সামনে দাঁড়াতে হয়। সফল শিল্পীদের ফিরে দেখতে হয়, পেছনে ফেলে আসা সৃষ্টির পথ। অষ্টম বছরে দশম নাটকের ক্ষেত্রে আয়নার মত এই ‘নাটক সম্ভূত নাটক’ নির্বাচন করে পরিচালক শ্রী রক্তিম সেন চিন্তাশীলতার পরিচয় দিয়েছেন। এটা মনে হয়েছে যে ‘মিরর ইমেজ অব দ্য রেপ্লিকা অব রিয়্যেল লাইফ।’

দর্শক হৃদয় জয়ের স্বীকৃতির পথ অর্জন করতে হয় অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে। এই দশম নাটকের মধ্য দিয়েই, আটলান্টার মানুষের শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের মধ্য দিয়েই, তৈরী হয়েছে স্বীকৃতি অর্জনের এই দীর্ঘ পথ। পরিচালক শ্রী রক্তিম সেনের তরফে আগামী দিনের সম্ভাবনাময় প্রতিশ্রুতির তালিকার মিছিলে রয়েছে ‘রক্তকরবী’ ও ‘টিনের তলোয়ার’। দশম প্রোডাকশনের সাফল্য সুবাদে ধন্যবাদ জ্ঞাপন ও শুভেচ্ছা জানানোর পাশাপাশি আটলান্টার নাট্যপ্রেমীদের থাকবে সাগ্রহ প্রতীক্ষা।

Play Reviews