DenaPaona (2019)- Review (Bengali)

নাটক ‘দেনাপাওনা’

:: শুভশ্রী নন্দী (রাই)

[শুভশ্রী নন্দী নিয়মিত ভাবে আনন্দবাজার পত্রিকা, আজকাল ও অন্যান্য পত্রিকা জন্য লেখেন এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যানুষ্ঠান উপস্থাপনা করেন।]


নাটক: ‘দেনাপাওনা’। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গল্পগুচ্ছ’-এর গপ্পে তার আদিসূত্র। সার্বিক ভাবে বাঙালী সমাজে একটা ‘ইটারনেল প্যাথোস’ এই ‘পণ’ সংক্রান্ত সামাজিক প্রথাকে ঘিরে থাকে, যা ৮০-র ও ৯০ দশক থেকে আজও, খোদ কলকাতার বুকে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত তো বটেই, এমনকি ‘আপাত ভদ্র-তথাকথিত’ শিক্ষিত-উচ্চবিত্ত বাড়ীতে, বিলুপ্ত না হয়ে প্রাসঙ্গিক। সুরূপা গুহ থেকে দেবযানী ভৌমিক —মায় হালের মিতা অবধি তালিকার শেষ করা যাবেনা। ‘ফেস অফ’ কিংবা ‘আন্ডার দ্য টেবিল’ : লড়াই আজও অব্যাহত। সেই প্রেক্ষাপটে সম্পূর্ণ একটা অন্য ঘরানার ‘প্রতিরোধ-বোধ’ তৈরী করে, সমকালীন করে নিয়ে সৌমিত্র বসুর এই চিত্রনাট্য এবং পরিচালক ডক্টর রক্তিম সেনের এই নাটক উপস্থাপনায়, বিশেষ ‘বিষয়’ হিসেবে ‘পণ প্রথা’-কে বেছে নেয়া একটা সাধু সামাজিক বার্তা, যেখানে আজ মেয়েরা বলতে পারে: ‘আজকের সমাজে আমার ভাগ্যনিয়ন্তক আমি।’ শুধু তাই নয়, সচরাচরের গলগ্রহ বাবা-মায়েদেরও এই লড়াই-এ, সে পাশে পেয়ে যায়। কিন্তু একদিনে তো এই পথ তৈরী হয়নি। লড়তে লড়তে কয়েক যুগ পেরিয়ে এখানে এসেও, সচেতনতার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করা ‘গল্পগুচ্ছ’-কেও কৃতজ্ঞতা জানাতে ভোলেন না লেখক। তাই গল্পগুচ্ছের পাতা থেকেই আরো জীবন্ত হয়ে বেড়িয়ে আসে ‘নিরু’ চরিত্র। এবং আজও প্রখরভাবে একটি আধুনিক শিক্ষিত মেয়ের ‘মেধা’ ও ‘বোধ’-কে নাড়া দেয়। আবিস্কৃত হয় একটি বিকল্প ‘পথ’ যা ‘গেছে বেঁকে’ আমাদের চেনা চিরাচরিত ‘পথের থেকে অনেক দূরে।’ পরিস্ফুট হয় একটা গল্পের মধ্যে আরেকটা গল্প -যা ঝিনুকের মধ্যে নিটোল মুক্তোর মত হয় উদ্ভাসিত। একটা ‘বই’ এর সামাজিক দায়, দায়বদ্ধতা ও আবেদন যে কতটা সুদূর প্রসারী হয়ে পরিবর্তনের পথ দেখাতে পারে —তার সার্থক রূপায়ণ এই নাটক।

শুরুতে ঋচা সরকারের উপস্থাপনা ছিল খুব সুন্দর ও মনোগ্রাহী।

দ্বৈত ভূমিকায় মায়ের চরিত্রটি সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন অভিনেত্রী । তাঁর আঁচল খোঁটা, নিজেকে ‘বুড়িমাগী’ জ্ঞানে তাঁর সব গয়না কন্যার বিবাহে দান করাতেই তাঁর স্বোয়াস্তি। সংসারের প্রয়োজনে নিজেকে ‘তুচ্ছাতিতুচ্ছ’ জ্ঞান করাই সেই প্রজন্মের যে বিশেষত্ব ছিল, তা সুন্দরভাবে তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন। পাত্রীর মায়ের নিজেকে এই ‘তৃণসম’ হেয়জ্ঞান সেই প্রজন্মের মনোভাব বয়ে নিয়ে বেরিয়েছে। সেদিক থেকে দেখতে গেলে, ‘সাফল্য’ দিয়ে লড়াই এর বিচার না করলে, বিপ্লবের সূত্রপাত তাই এক নিরুপমা থেকে অন্য আধুনিকা কন্যা পর্যন্ত ।

রায়বাহাদুর শ্বশুরের স্বচ্ছন্দ পটু অভিনয় সত্যিই নজর কেড়েছে সকলের। তাঁর সংলাপ নিক্ষেপণের ভাবনাচিন্তায় প্রকাশ পেয়েছে ‘ডাইনামিজম’। যেমনি তাঁর রেন্জ, তেমনি ভেরিয়েশন। পুত্রকে বিয়ের আসর থেকে উঠে আসার সিদ্ধান্তজনিত উচ্চকিত পদক্ষেপ, উদ্ধত পদচারণা সত্যিই চরিত্রটিকে জীবন্ত করে তুলেছে।

আধুনিকা মেয়ে হিসেবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় জোড়ে জোড়ে শ্বাস ফেলার মধ্য দিয়ে হতাশা ও দ্বিধার প্রকাশ সুন্দরভাবে প্রকাশ করেছেন নায়িকা। আলোছায়ার খেলায় দ্বিধাদ্বন্দ যেমনি প্রকাশ পেয়েছে, কাগজে লিখে সাথে সাথে দলা পাকিয়ে ছুঁড়ে ফেলা, তেমনি দেশলাই জ্বালানো-নেভানোর মধ্যে মুখে প্রতিফলিত হওয়া আলোতে, চিৎকারে না ভেঙে পড়ে, ধরে রাখা কান্না খুব সাবলীল ঠেকেছে। এই দৃশ্যটির পটভূমিকায় তিলে তিলে তৈরী হয়েছে নিজস্ব সিদ্ধান্তের দৃঢ়তার সৃজনে নিজের সাথে নিজের অনুচ্চারিত সংলাপ রচনা। যখন আধুনিকা কন্যাটি মা-বাবার মুখ থেকে তাঁদের স্বতোপ্রণোদিত হয়ে বিয়ের প্রস্তাব নাকচের কথা শুনল, তাঁদের এই চিন্তাভাবনা মধ্যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন দেখে সাময়িক ‘হতভম্ব’ হয়ে তাকিয়ে থাকাটা খুব সুন্দর ভাবে ব্যক্ত করেছেন চরিত্রটি।

কিংকর্তব্যবিমূঢ বাবা কখনো দুই ছেলের চাপে দ্বিধাখন্ডিত। তাঁর অভিনয়ে অসোয়াস্তি ও অসহায়তার প্রকাশ খুব সুন্দরভাবে তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন।আবার একইভাবে তাঁর আর্ত কাকুতি-মিনতি যে ‘লগ্নভ্রষ্টা হয়ে যাবে’ -বা মেয়ের সাথে দেখা করার আর্তি —-একটা অসহায় কন্যাদায়গ্রস্ত পিতার প্রজন্মকে অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি প্রতিনিধিত্ব করেছেন দায়িত্বজ্ঞানসম্পন্ন ভাবে। জামাইএর গায়ে হাত রেখে কৃতজ্ঞতায় ভেঙ্গে পড়া কান্নাও খুব ছুঁয়ে গেছে মন।

টোপর হাতে, মালা গলায় বিয়ের আসর থেকে উঠে আসা জামাইটি কিংবা ম্যাজিস্ট্রেটের পোশাক পরিহিত অবস্থায় চরিত্রটির, দৃঢ স্বচ্ছ্বন্দ অভিনয় খুব মানানসই হয়েছে। স্বল্প সময়ের জন্য হলেও, ওই চরিত্রটির গুরুত্ব ছিলো অপরিসীম, যেহেতু এই প্রতিবাদী চরিত্রটি আগামী সমাজের আধুনিক মানসিকতার প্রতিভূ হয়ে ধরা দেয়। পাত্র সেটি সুন্দরভাবে পালন করেছেন।নিরূপমা ও তাঁর স্বামীর কথোপকথনের প্রথম দৃশ্যটি সেই প্রজন্মের স্বামী-স্ত্রী র সম্পর্কের আড়ষ্টতাময় দূরত্বটিকে ফুটিয়েছে নিখুঁতভাবে।

তবে একথা বলতেই হবে যে হর ও রাম, দুই ছেলেই অভিনয়ে কেতাদুরস্ত। তাঁরা যে যার মত করে সংলাপ নিক্ষেপে বা অভিনয়ের নিজস্ব রীতি মেনে, বাবার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে। পুত্র যখন বলেন, “আত্মহত্যা করব।” -সেই বলা এত মার্জিত ভঙ্গীতে যে সেখানে ‘চড়া’ না হয়ে বাচনভঙ্গীর ‘দৃঢ়তা’ প্রকাশ পায়। এভাবেই রাবিন্দ্রিক সংলাপ নিক্ষেপের মর্যাদার অক্ষুণ্ণতা বজায় থাকে অনিবার্যভাবে।

এবার আসি নিরূপমা প্রসঙ্গে। পুরো নাটকটির শিড়দাঁডা হয়ে দাঁড়িয়েছিলো সে। অনবদ্য অভিনয়। তাঁর প্রত্যেকটি সংলাপের গা ছমছমে নিক্ষেপণে সে তাঁর ‘প্যারা-রিয়েলিটি’ অস্তিত্ব সরলভাবে ফোঁটাতে সক্ষম হয়েছে। যেমনি এ যুগের আধুনিকা মেয়ের চমকে ওঠার অভিব্যক্তি, তেমনি নিরূপমা-র সংলাপ, “ভেবেছিলে…”, “মনে হয়েছিল তোমার…”, “মনে হয়েছিলো না?”, “কি হয়েছিল তো?”- প্রত্যেকটি ‘সংলাপ-অংশ’ (dialogues segment)এত অনায়াসে বিশ্বাসযাগ্যভাবে এত কম সময়ের মধ্যে বিভিন্নতায়-বৈচিত্রময়তায় আলাদা মুডে বলা হয়েছে যে, অভিনয়ের শৈলীতে দখলদারী ছাড়া এ সম্ভব নয়। নিরুপমার ভয়েস ভলিউম অসাধারণ একই সাথে তাঁর ‘বিবেক-ঝাঁকুনি’ দেয়া আপাত আবদারি কথোপকথনও খুব সুন্দর।যেমন, “টাকা যদি দাও, তাতেই তো অপমান-তোমার মেয়ের কি কোনো মর্য্যাদা নেই? আমি কি টাকার থলি? যতক্ষণ টাকা আছে, ততক্ষনই আমার দাম? ” অথবা দঁড়িয়ে অতীতচারণ করা দৃশ্যে,- সময়ের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে মনে করে বলা, “একবার বলেছিলাম, …বাবাকে।” তাঁর পরিমিত কান্না, সংলাপের সাথে ভারসাম্যতা রক্ষা করেছে শৈল্পিক ভাবে। শেষের দিকে অন্য আঙ্গিকে নিরুপমার সংলাপ বিষণ্ণতায় খুব সুন্দর উপস্থাপিত হয়েছে। ‘মরুভূমি ঝলসে দিচ্ছে। ..সূর্য্য পুড়িয়ে দিচ্ছে।…স… ব …’—.তাঁর শুকনো শূন্যতায় ভরা কণ্ঠে যেকোন সংবেদনশীল দর্শকের গলায় আটকে যায় দলা পাকানো কষ্ট।

পাত্রের মায়ের অভিনয় খুব স্বাভাবিক ছিল। গালমন্দ, প্রভুত্ব বিস্তার করার প্রবণতা , ছোট করে কথা বলার মধ্যে যে নীচতার প্রকাশ, চারিত্রিক সেই জায়গাটাকে ধরে রেখে সংলগ্নতা রক্ষা করেছেন তিনি আগাগোড়া । অভিনয়ের স্বতস্ফূর্ততা বলে দেয় চরিত্রটির ভেতরে গিয়ে তিনি অভিনয় করেছেন।

পোষাকে মুনমুন সেন, সেট্-এ ভাষ্কর ভৌমিক, প্রোডাকশন ম্যানেজার/লাইটিং এ কল্লোল নন্দী, প্রডাকশন এসিসট্যান্ট দেবু বাসু, প্রপস্ ম্যানেজার কৌশিক বাসু, সহকারী রাজীব দে, করি গিয়েসেন ও শন্ কলিন্স সকলকে নিয়ে একটা টিম স্পিরিট কাজ করেছে সুসম্পন্ন ভাবে যা পরিচালকের সুচারু নেতৃত্ব স্পষ্ট করে।

পরিচালনা: পরিচালনার ক্ষেত্রে ডক্টর রক্তিম সেনের শিল্পবোধের সূক্ষ্মতার ছাপ স্পষ্ট হয়েছে বারবার। নায়িকার আগুন জ্বালানো-নেভানো-র মধ্য দিয়ে পরিচালক ‘দোটানা মন’ -কে খুব সাংকেতিক ভাবে তুলে ধরেছেন দর্শক হৃদয়ের কাছে। গোটা পরিবেশনাটি খুবস্পর্শকাতরতায়, সূক্ষতায়, শৈল্পিক ভাবে পরিপক্কতায় হেন্ডেল করা হয়েছে। একটি ছোট্টে টেবিল ও একটি কাপ-প্লেট একটি নিহ্সঙ্গ চরিত্র হিসেবে ধরা দিয়েছে ও একই সাথে পরিবেশের নিহ্সঙ্গতা ব্যক্ত করতে সাহায্য করেছে। দরজার দুপাশে দুজন দাঁড়ানো নারী দুই যুগের সঙ্কেত বহন করেছে শিল্পসম্মত ভাবে। এ যেন দুই যুগের কথোপকথন। ‘উত্তোরণ’ আর ‘অভিপ্সা’-র সংলাপ বিনিময়। একই সাথে পূর্ব ও উত্তর কন্যার সংলাপ বিনিময় সময়ের হাতছানিতে নারীর সামগ্রিক অবস্থানের অগ্রসরতার দিকে দিক নির্দেশ করেছে এই দৃশ্যটিতে।

সঙ্গীত মূর্ছনা, আলো এক কথায় অনবদ্য। পরিচালক ডক্টর রক্তিম সেনের প্রত্যেকটি নতুন নাটকের সাথে আলো-সংক্রান্ত একটি নতুন কিছু আমরা উপহার পাব বলে অপেক্ষা করি। এবারে …..ছিল স্ক্রীনটি। একে মধ্যমনি করে ফ্রন্ট ও ব্যাক স্টেজের আলোর ‘সুইফ্ট ‘ এবং তৎসহযোগে দৃশ্যপটবদল করা হয়েছিল খুব মুন্সীয়ানার সঙ্গে। ব্যাক স্ক্রিন এ উদ্ভাসিত আলো এবারের একটি নতুন কাজ। এর আগে আমরা দেখেছি ‘একটি অবাস্তব গল্প’ -তে লাল আলোর আভার প্রেক্ষাপটে ‘ফাঁসির ঝুলন্ত দড়ি’, ‘শুভ জন্মদিন’-এ ‘তারাভরা আকাশ’, ‘দুই হুজুরের গপ্প’-তে ‘অগ্নিকুন্ড’, —তাই প্রতিবছর ই আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে থাকি যে এবছরের আলোর কি নতুন কাজ দর্শকেরা উপহার পাবো। প্রতি বছরের মত এবারও তিনি আমাদের হতাশ করেননি।

সুর ব্যবহার এক কথায় অসাধারণ ভাবে মর্মস্পর্শী। মেয়েকে দেখার জন্য অপেক্ষারত পিতার দৃশ্যের প্রেক্ষাপটে করুণ রসের সংগীত-ব্যবহার যেন হৃদয়-নিংড়ান হৃদয়-বিদারক সুর, যা দর্শকমন ছুঁয়ে গেছে অব্যর্থ ভাবে। বাপেরবাড়ি আসার আয়োজনের সাথে ঢাকের আওয়াজের সংযোগ- সব এক কথায় পরিস্কার করে বুঝিয়ে দেয় এই বিষয়টি। সংগীত ব্যবহারের ক্ষেত্রে বলতে হবে যে রবীন্দ্রসংগীতের “ক্লান্তি লাগে, পায়ে পায়ে”- খুব সুন্দর ব্যবহার হয়েছে নিরুপমার বরের ফিরে আসা পায়ের পদক্ষেপের সাথে। সংগীত ব্যবহারে মুখরা ‘আমার এই পথ’ শেষ পর্যন্ত ধরে রেখে অন্তরা ও সঞ্চারীর ব্যবহার খুব সুক্ষ শিল্পবোধের পরিচায়ক। শেষে ‘দুটি পথ’ ব্যাপ্তিতে দুটি প্রজন্ম হয়ে গেলো, যখন স্পষ্ট ভাবে বলা হলো সংবেদনশীলতায়—“ তোমার পথের থেকে অনেক দূরে আমার এই পথ গেছে বেঁকে ।” গায়ক গায়িকার কন্ঠ ও শব্দ খুব শিল্পসম্মতভাবে ব্যবহার করা হয়েছে।

দুই ছেলে ও বাবার মধ্যে বয়সের ফারাকটা আরেকটু সাজ পোশাকে ‘বিশেষ’ ও ‘প্রকট ‘ করতে পারলে ভালো হ’ত। দুটি যুগ প্রতিনিধিত্ব করার দরুণ দুটি সমান্তরাল ভূমিকা হেতু হয়তো বাবার চুল বেশী সাদা করা সম্ভবপর ছিলো না। কিন্তু মনে হচ্ছিলো যে লাঠি, পায়ের জুতো ইত্যাদিতে বয়সের আধিক্য হয়তো কি আরেকটু আরোপিত করা যেত? প্রত্যেকটি নারী চরিত্রের পোশাক যেন রাবীন্দ্রিক ধারা থেকে বেড়িয়ে এসে আধুনিকতায় স্পষ্ট । কালো ঢাকাই শাড়ী, সধবা-বিধবা নির্বিশেষে কালো টিপ-সুরুচিসম্পন্ন নির্দ্বিধায়। হয়তো পুরোন জামানা-‘ফ্ল্যাশব্যক’ কিংবা ‘দুটি যুগ’ স্পষ্ট করতে কিংবা ‘অশরীরি’ বোঝাতে ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু জামাইটির ‘বর-বেশ’-এর মধ্যেও সাদা-কালো-র হাল্কা আবেশ রাখলে ভাবনার সংলগ্নতা থাকত যথার্থ ভাবে এবং দর্শক হৃদয়ে ভাবনাটিকে প্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য করত হয়তো।
পুত্র হব আর রাম সংক্রান্ত ব্যাপারে স্ত্রীকে জেরা করার সময় মধ্যবিত্ত সংসারের এই জায়গাটা, নাট্যরূপে ও পরিচালনায় খুব ভালো করে ফুটে উঠেছে। শেষ আশ্রয় হিসেবে যখন স্ত্রীর কাছেও বিশ্বাসের জায়গাটা আলগা হয়ে যায়, স্বামী শূণ্যতায় বলে ওঠেন, ‘ আমায় একটু একা থাকতে দাও।’ এটাই নিজের মধ্যে অনেক কিছু ভার বয়ে নিয়ে, নিজেকে খুলতে না পারা বাড়ির কর্তা বা পুরুষমানুষের ভাগ্যের নিদান। একাকিত্বের কাছে আত্মসমর্পণ করতে করতে তাঁর বয়ানের সাথে প্রেক্ষাপটের সুচিন্তিত সংগীত এক শিল্প-সুধা হয়ে ওঠে।

আশ্বিন মাস উচ্চারণের সাথে সাথে কন্যার বাপের বাড়ি যাবার আর্তি, পুজো উপলক্ষ্যে কন্যার বাড়ি আসা- দুর্গাপুজোর ঢাক, বাজনা সবকিছুর মিশ্রনে সার্থক রূপায়ণ হয়েছে মঞ্চের দৃশ্যটি । ঘরের মেয়েকে মা দুর্গার সাথে গুলিয়ে ফেলতে ভালোবাসে বাঙালি। তাই পর্দার এপার ওপারে বাবা মেয়ের সংলাপের মধ্য দিয়ে দৃশ্যের সাথে দর্শকের একাকীত্ববোধের প্রাণ ছুঁয়ে গেছে সকলের ।
এই নাটকটি পরতে পরতে মেলে ধরেছে আমাদের ঘুণে ধরা সমাজের মধ্যবিত্ত সংসারের ভনিতা, শঠতা, ‘চাচা আপনা প্রাণ বাঁচা’ সুলভ ..পিঠ বাঁচানোর শৈলী । সংসার-অঙ্গনও যে সূক্ষ্ম রাজনীতির ক্ষুদ্র সংস্করণ তা প্রকাশ পায় অবহেলিত বধূর মৃত্যু উৎযাপনের বৈভবে চন্দন কাঠের চিতা-র উল্লেখে বা মৃত্যু সংবাদ খবরের কাগজে প্রকাশের উচ্চারণে।
কার্তিক মাস তো? শীত .. নিজের যত্ন তো নেয় নি…শ্বশ্রুমাতার নিজের কাছে নিজের ‘জবাব’ তৈরী নিজের মতো করে ….এই তো ভবিতব্য হয় শোষিত মেয়েদের জীবনে । এর মধ্যে অপরাধবোধ নেই, রয়েছে স্বার্থ জনিত আত্মরক্ষার নির্লজ্জ প্রয়াস। আপনি ওঁকে লিকে দিন। ..অতএব অবিলম্বে দুটি লাইন।.”চলিয়া আইস” । তোমার জন্য আরেকটি সম্বন্ধ স্থির করিয়াছি। ..হাতে হাতে ….. টাকা পণ দিবে। প্রত্যেকটি নাটকের কিছু বিশেষ ‘সিচুয়েশন’ বা মূহুর্ত থাকে । পরিচালকের মননের স্বাধীনতা ও চিন্তাশীলতা অনুযায়ী সেই দৃশ্য নির্মাণ হয়। চিঠি হাতে আবছায়াতে পত্রপাঠে ব্যপৃত পাত্র। দৃশ্যটি আয়না হয়ে ধরা দেয় দর্শকদের কাছে, শুধু তাই নয়, দর্শককে মুখামুখি দাঁড়াতে বাধ্য করে। ‘দীর্ঘশ্বাস’ ও ‘ধিক্কার’ সেখানে অজান্তেই মিলেমিশে একাঙ্গী হয়ে ওঠে।

রবীন্দ্রসংগীতে শেষ।নাটকটি শেখায় যে আধুনিক পরিবর্তিত চিন্তা ভাবনা খুব সুন্দর । সময়ের প্রয়োজনেই কিছুটা অন্তত এসেছে। কিন্তু নাটকটি এও শেখায় যে, ‘দিন’ বদলেছে, তবু ‘চাহিদা’ কিন্তু আজও বদলায় নি। শতবর্ষ পূর্বে লেখা গল্পগুচ্ছের ‘দেনাপাওনা’ আজও প্রাসঙ্গিক। তবু আশার বার্তা: সেযুগে নিরুপমা সরব হলেও প্রতিবাদী নয়, তাঁর বর প্রতিবাদ করেছে। আজকের নিরুপমার গৌরবে বহুবচন হয়ে প্রতিবাদ করে । শুধু তাই নয়, কোন কোন ক্ষেত্রে পাশে পায় তাঁর পরিবারকেও। সার্বিকভাবে যাতে সমর্থন পায়, সেই সচেতনতা জাগানোর জন্যই এই নাটক মঞ্চায়ণের প্রচেষ্টা সার্থক।  

Play Reviews